ছোট ছোট যে কথাগুলো শিশুর আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে
আত্মবিশ্বাস কখনো ঢাকঢোল পিটিয়ে আসে না। শিশুর মনে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে। এর পেছনে কাজ করে প্রতিদিনের আচার-আচরণ। আমরা কীভাবে শিশুর সঙ্গে কথা বলছি, তাও শিশুর মধ্যে প্রভাব ফেলে।
সাধারণত প্রত্যেক শিশুর রুটিন প্রায় একই রকম। দরজার পাশে স্কুলব্যাগ ছুড়ে ফেলা, হোমওয়ার্ক শেষ না করা, মোজার জোড়া না মেলা, আর অহেতুক প্রশ্ন করা। এমন সময়ে এসব ঘটে যখন বড়রা ব্যস্ত থাকে। স্বাভাবিকভাবে তখন অভিভাবকরা চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। কিন্তু এই চিৎকার-চেঁচামেচি শিশুর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। ওরা এগুলো দীর্ঘদিন মনে রাখে। এই শব্দগুলোই শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় কিংবা কমায়।
আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে
কিছু শিশু ঘরে ঢুকেই মনে করে, ঘরের সবকিছুর মালিক সে। আবার কেউ দরজায় বাইরে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করে, ভিতের কে বা কারা আছেন। অর্থাৎ সব শিশুর আত্মবিশ্বাস এক রকম হয় না। তবে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে অভিভাবকরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। কিন্তু কীভাবে?
অভিভাবকরা সাধারণত শিশুর বড় সাফল্যের প্রশংসার করেন। কিন্তু ছোট ছোট সফলতাকে এড়িয়ে যান। অথচ ছোট ছোট মুহূর্তে বলা কথাগুলোই শিশুর মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।
'ভালো করেছ' নয়, 'তুমি চেষ্টা করেছ'
'তুমি ভালো করেছ' এই কথাটা শুনতে ভালো লাগে। তবে এ ধরনের কথা প্রায়ই বলা হয়, তাই শিশুর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে না। কিন্তু চেষ্টার কথা বলা হলে শিশুর মধ্যে এক ধরনের প্রণোদনা কাজ করে। যখন বলা হয়, 'কাজটা কঠিন ছিল, কিন্তু তুমি চেষ্টা করেছ'। এই কথায় শিশুর মনে একটা পরিবর্তন আসে। সে বুঝতে পারে, চেষ্টা করাটা লজ্জার নয়। বরং চেষ্টাই একজনকে এগিয়ে রাখে।
মনে রাখতে হবে, আত্মবিশ্বাস সব সময় সফলতা থেকে আসে না। বরং চেষ্টা থেকে বেশি আসে।
'তোমার ধারণা ঠিক আছে'
আত্মবিশ্বাস কেবল দক্ষতা বা পারফরম্যান্সের বিষয় নয়। এটা আবেগেরও বিষয়। যেসব শিশু নিজের বিবেচনা ও ভাবনাকে নিরাপদ মনে করে, তাদের আত্মবিশ্বাস বেশি হয়। তারা দৃঢ় মনোবলের হয়।
বিপরীতে তাদের ভাবনাকে মূল্যায়ন করা না হলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তারা ধরে নয়, তাদের অবহেলা করা হচ্ছে। তখন অনেক কিছু লুকিয়ে ফেলে, নিজের মতামত প্রকাশ করে না। কিন্তু শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হলে, ওর ভেতরে স্থিরতা তৈরি হয়। একটা বিশ্বাস জন্মায়।
শিশুকে যদি বলা হয়, 'তোমার ধারণা ঠিক আছে', তাহলে সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এই কথা শিশুকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দেয়।
'তোমার মতামত বলো'
পরিবারের মধ্যে কোনো বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। তখন হয়তো বড়রা থেমে বলল, 'এবার তোমার মতামত বলো'। এই কথাটা শিশুর মধ্যে জাদুর মতো কাজ করে। ওরা বুঝতে পারে, তাদের কথাকে গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে।
হয়তো তাদের সব কথা গুরুত্বপূর্ণ হবে না, কিছু কথা বারবার বলবে, কিছু এলোমেলো, কিছু একেবারেই অর্থহীন। কিন্তু সেগুলো শুনলে শিশু নিজের কথাকে বিশ্বাস করতে শেখে। এটাই ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে।
'ভুল হতেই পারে'
অনেক শিশু ভুল করতে ভয় পায়। তাদের ধারণা ভুল করলে অভিভাবক বকাবকি করে। এ কারণে তারা খাতা ছিঁড়ে ফেলে, উত্তর দিতে দেরি করে। কিন্তু ভুল করার পর যদি বকাবকি না করা হয়, তাহলে ওরা ঝুঁকি নিতে শেখে। আর ঝুঁকি থেকেই পরে বড় কিছু করে।
শিশুর জন্য এই সাহসটাই বেশি দরকার। এজন্য খুব বেশি কিছু করতে হয় না। ভুল করার পর 'ভুল হতেই পারে' এই কথাটাই যথেষ্ট।
'তুমি পারবে'
আত্মবিশ্বাস মানে সব প্রশ্নের উত্তর জানা নয়। আত্মবিশ্বাস মানে অজানা বিষয়কে জানার চেষ্টা করা। যখন বড়রা শিশুকে সামনে এগিয়ে দেয়, তখন সে অন্যের ওপর ভরসা করার চেয়ে নিজের মতামতকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
একটি ছোট্ট ধাঁধা, বন্ধুর সঙ্গে ঝামেলা, ছোট একটা ভুল—এগুলো শিশুর জীবনে আত্মবিশ্বাসের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে।
শুধু তাকে বলতে হবে, 'তুমিও পারবে'। এই কথা শিশুর মনোবল বাড়াবে। ওরা বুঝতে পারবে, তার ওপর আপনার বিশ্বাস ও আস্থা আছে। Source: bangla.thedailystar.net
